খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
স্বপ্নরাজ্য সিকিমের শেষ প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জি লাঞ্ছিত ও অপমানকর অবস্থায় মারা যান। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর অংশের একটি পার্বত্য স্টেশন কলিম্পং, এটা ছিল এক সময়ের সারাবিশ্বের তারকাদের মিলনমেলা। এখানকার বেশির ভাগ বসবাসকারী ছিল নেপালের। তারা এ সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারেনি। কয়েক বছর আগেও এখানে বাস করত ভারতভুক্ত হওয়া একটি রাষ্ট্রের শেষ প্রধানমন্ত্রী কাজী লেন্দুপ দর্জি। তিনি ২০০৭ সালের ২৮ জুলাই ১০৩ বছর বয়সে মারা যান। তিনি সিকিমের স্বাধীনতা হরণের একমাত্র নায়ক।
বর্তমান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত একজন দেশদ্রোহীর কুখ্যাতি নিয়ে বেঁচে থাকা ব্যক্তি সেই লেন্দুপ দর্জি বলেন, সবাই আমাকে সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্তির জন্য দায়ী করে। আর এর জন্য আমি একাই দায়ী। ভুটান টাইমসের মূল সূত্রে উদ্ধৃত ‘প্রাউড টু বি এ সিকিমিজ’ নামক ব্লগে পোস্ট করা হয়েছে ২০০৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর। সেই সিকিমের স্বাধীনতা হরণের ইতিহাস আজও সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল জাগায়।
কয়েক দশক ধরে লেন্দুপ দর্জি কলিম্পংয়ের ‘চাকুং হাউস’ নামক বাড়িতে একাকী বসবাস করেছেন। তার এই অবহেলিত ও অসম্মানজনক মৃত্যুতে খুব কম লোকই তাকে স্মরণ করেছে।
তিনি দিল্লির কাছেও অবহেলিত হয়েছেন বলে তার কথায় প্রমাণিত হয়েছে ‘আমি সিকিমকে ভারতভুক্ত করেছি, কিন্তু কাজ হয়ে যাওয়ার পর ভারত আমাকে লাঞ্ছনা বঞ্চনা দিয়েছে। এক সময় আমাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হতো। বর্তমানে ভারতের দ্বিতীয় শ্রেণীর নেতাকর্মীদের সাথেও দেখা করতে আমাকে ১ সপ্তাহের বেশি সময় কাটাতে হয়।’ ২০০২ সালের কথায় দিল্লির প্রতি লেন্দুপের ক্ষোভ চরমে পৌঁছে। একসময় যে ভারতীয় নেতারা তাকে উষ্ণতার সাথে বরণ করত তাদের মাঝে জওহর লাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর মতো নেতা-নেত্রীরাও ছিলেন। প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর তিনি ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতার পর নেহরুর পরামর্শে সিকিম স্টেট কংগ্রেস (সিএনসি) রাজা বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। সিকিম এ সঙ্কট প্রায় কাটিয়ে উঠেছিল, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর হিমালয়ে এই রাজ্যটি উপায়হীন কঠিন সঙ্কটে পতিত হয়। ১৯৭৩ সালে লেন্দুপের নেতৃত্বে বিরোধী আন্দোলন সিকিমের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। ভারত প্রকাশ্যে রাজ্য পালডন থানডপ নামগয়াল বিরোধী আন্দোলন সমর্থন শুরু করে। রাজার এডিসি সোনমযোঠা দাবি করেছিলেন, ভারতীয় সেনারা সর্বসাধারণের বেশে এসব বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। আসলে এসব বিক্ষোভকারীকে দার্জিলিং ও আশপাশের এলাকা থেকে আনা হয়েছিল। এখানে সিকিমের জনতার অংশ নেয়া তেমন একটা ছিল না। কিন্তু লেন্দুপের বিক্ষোভ আন্দোলন ছিল ভারতীয় অর্থায়নে। ইন্টিলিজেন্ট ব্যুরোর (আইবি) মাধ্যমে অর্থকে সহজলভ্য করা হয়েছিল। আর আইবির লোকজন বছরে দুই-তিনবার দেখা করতে আসত। আইবির এজেন্ট তেজপাল সেন ব্যক্তিগতভাবে তাকে অর্থ দিয়ে যেত।
প্রকৃতভাবে সিকিম খেলার অধিনায়ক ছিল ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড এনালাইসিস উইং) ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। সিকিমের ভারতভুক্তি তাদের একটি ঐতিহাসিক অর্জন। ‘র’ এর কৌশল ছিল সিকিমের ব্যাপারে ভুটান নিয়ে হওয়া ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা। ভুটান ১৯৬৮ সালে জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ লাভে সমর্থ হয়। এ জন্যই তারা লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলে। যা অশোক রায়না তার ‘ইনসাইড র’ গ্রন্থের দ্য স্টোরি অব ইন্ডিয়ান সিক্রেট সার্ভিস অংশে বর্ণনা করেছেন। ‘আমরা মনে করেছিলাম রাজা আমাদের সাথে অন্যায় করছে’ গ্যাংটক টাইম-এর সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ডিসি রায়ের ভাষ্য, ‘আমরা ভেবেছিলাম, রাজার হাতে শোষিত হওয়ার চেয়ে ভারতের নাগরিক হওয়াই উত্তম হবে।’ লেন্দুপের কাজী বংশের সাথে সিকিমের রাজবংশের ঐতিহাসিক শত্রুতা ছিল। লেন্দুপের ভাষ্য সে চেয়েছিল জনবিক্ষোভের মাধ্যমে রাজাকে চাপ দিতে; কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় রাজা কখনোই এই সমস্যা সমাধানে কোনো ভূমিকা নেননি।
ভারতের অনৈতিক চাপে সিকিমের রাজা সিএনসিও ভারতের সাথে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নিতে বাধ্য হয়। এই আলোচনা শুধু রাজার ক্ষমতাই খর্ব করেনি, বরং সিকিমকে ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত করে। ১৯৭৪ সালে লেন্দুপের সিএনসি পার্লামেন্টে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সরকার ও রাজা একে অপরকে শত্রু মনে করত। যার কারণে ১৯৭৫ সালের ২৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ সভায় রাজতন্ত্র বিলোপের সিদ্ধান্ত হয় এবং সিকিমের সংসদ এটা অনুমোদন করে। আর গণভোটের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তের ঠিক ৪ দিন পর দেশের ৫৭টি ভোটকেন্দ্রের রায়ে রাজতন্ত্র বিলোপ হয়।
এক সাক্ষাৎকারে ভারতের কৃষিমন্ত্রী কে সি প্রধান বলেন, ওই গণভোট একটা গোজামিলের কারণ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি আরো বলেন, ভারতীয় সৈন্যরা অসহায় ভোটারের দিকে বন্দুকের নল তাক করে কারচুপির ভোট করেছিল। এ গণভোটের পরই কাজী লেন্দুপ দর্জি সিকিমকে ভারতের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব উত্থাপন করে। সংসদের ৩২ আসনের মধ্যে ৩১টিই তার দলের থাকায় এই প্রস্তাব মুহূর্তেই পাস হয়ে যায়। আর এতেই বোঝা যায়, ভারতই এই কারসাজির মূল নায়ক। সিকিমে নিযুক্ত তৎকালীন ভারতীয় দূত বিএল দাশ তার ‘সিকিম সাগা’ বইতে লিখেছেন, ‘ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সিকিমের অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আমরা শেষ পর্যন্ত সেই কাজ করতে পেরেছি’ হয়তো পালডন যদি বুদ্ধিমান হতেন এবং তার হাতে কাজ করতে পারতেন তাহলে এটা অত সহজে হতো না।
ভারত মূলত দ্বৈত খেলা খেলেছিল। এক দিকে সব ধরনের পন্থায় লেন্দুপকে রাজার বিরুদ্ধে সমর্থন করেছিল, অন্য দিকে রাজাকে আশ্বাস দিচ্ছিল, সিকিমের রাজতন্ত্র টিকে থাকবে। পালডন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অবৈতনিক জেনারেল ছিলেন, ফলে তিনি কখনো ভাবেননি তার নিজ বাহিনী এমন কাজ করবে। কিন্তু এটাই একটা বড় ভুল।
১৯৭৫ সালের ৬ জুলাই সকালে পালডন তার প্রাসাদেই ছিলেন। যখন ভারতীয় সেনা ট্রাকগুলো একে একে উঠে আসছিল, তখন তিনি বারান্দায় দৌড়ে আসেন। ততক্ষণে ভারতীয় সেনারা প্রাসাদের চারদিক ঘিরে ফেলে এবং কিছুক্ষণের জন্য মেশিনগানের গুলি চালায়। বসন্ত কুমার ছত্রিনামক মূল ফটকের এক প্রাসাদ রক্ষী প্রথম বুলেটেই প্রাণ হারান। পাঁচ হাজার সদস্যের ভারতীয় সেনা দলের ২৪৩ সদস্যের প্রসাদ রক্ষীদের দমাতে আধা ঘণ্টাও লাগেনি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সব শেষ হয়ে যায় এবং সাথে সাথে সিকিমের স্বাধীন পরিচয়ও মুছে যায়। বন্দী প্রাসাদ রক্ষীদের হাত উঁচু অবস্থায় ট্রাকে তোলা হলো। অতঃপর ভারতের ত্রি রাঙ্গা পতাকাটি সিকিমের পতাকার স্থলে স্থলাভিষিক্ত করা হলো। ১৯৬০ সালে নেহরু কুলদীপ নায়ারকে বলেছিলেন, সিকিমের মতো একটি ছোট দেশকে বল প্রয়োগ করে দখল করা মানে একটি মাছিকে রাইফেল দ্বারা গুলি করা। কিন্তু নির্মম পরিহাসের বিষষ, নেহরু কন্যা ইন্ধিরা গান্ধী ‘জাতীয় স্বার্থ’-এর নামে সিকিমকে ভারতের ২২তম প্রদেশে পরিণত করেন।
১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে লেন্দুপ দর্জির এসএনসি সংসদের একটি আসনও পেল না। ফলে কাজী বংশের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এখানেই ইতি ঘটে। এক সময় সে যখন নমিনেশন জমা দিতে যায়। তখন তার নাম ভোটার তালিকায়ও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সিকিমের ৪০০ বছরের পালডন রাজবংশকে শেষ করতে গিয়ে কাজী লেন্দুপ দর্জি নিজ মাতৃভূমিকে ভারতের মধ্যে সোপর্দ করেছেন। তার বিপরীতে পেয়েছেন আক্ষেপ, স্মৃতি হারানো নির্জন ভুতুড়ে জীবন ও অমর্জাদাকর লাঞ্ছিত মৃত্যু।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও মানবািধকার কর্মী।











