
খোন্দকার জিল্লুর রহমান
সুশাসন, ন্যায়বিচার, শান্তি এমন একটা শব্দ যার সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় এতোই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে এর যে কোনো একটিরও কোনোরকম ব্যত্যয় ঘটলে কোনো অবস্থাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মার্কিন মানবতাবাদী নেতা মার্টিন লুথার বলেছেন, কোনো জায়গায় অবিচার ঘটলে তা সব জায়গায় বিচারকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ফরাসি দার্শনিক আঁনাতোল ফ্রান্স বলেছেন, আইন সঠিক হলে মানুষও ঠিক হয়ে যায় বা মানুষ ঠিকভাবে চলে।
বর্তমান থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বের কথা, মুসলিম হতিহাসের দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন আল খাত্তাব তার সাম্রাজ্যের জন্য একজন জ্ঞানী-গুণী, সৎ, প্রজ্ঞাবান, সজ্জন ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাকে একটি প্রশ্ন করলেন, আমি যদি এমন কোনো অপরাধ করি যার শাস্তি মৃত্যুদ- হয়, তাহলে আপনি কি করবেন? মুহূর্ত অপেক্ষা না করে লোকটি উত্তর দিলেন তলোয়ারের এক কোপে আপনার দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলবো। ওমর বিন খাত্তাব তাকেই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ছিলেন একজন অপরূপা সুন্দরী নারী। এককথায় নূরজাহান অর্থাৎ অপরূপ সুন্দরী। সম্রাটের রাজপ্রসাদের ফটকে ছিল একটি ঘণ্টা যা বাজানো হতো কোনো অন্যায় বা অত্যাচারির কাহিনী সম্রাটকে শোনানোর পূর্বে। বলা যায়, কোনো ফরিয়াদি বিচারপ্রার্থী এই ঘণ্টা বাজালে সম্রাট তার দরবারে বসে অভিযোগ শুনতেন এবং সাথে সাথেই সুবিচার করতেন। একবার তিনি দরবারে এসে দেখলেন একজন নারী তার দরবারে করজোড় দাঁড়িয়ে আছেন তার অভিযোগ জানাতে। তার অভিযোগ তার স্বামীকে তীর নিক্ষেপে হত্যা করা হয়েছে। সম্রাট জিজ্ঞাসা করেন কে সেই হত্যাকারী? জবাবে ওই ফরিয়াদি বললেন, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান তার স্বামীর হত্যাকারী। বাদশাহ নূরজাহানকে হাজির করলেন। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান বললেন, হরিণ শিকার করতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ওই তীর দুঃখিনীর স্বামীকে আঘাত করেছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর আসন থেকে নেমে এসে তার একটি ধনুক ওই ফরিয়াদির হাতে দিয়ে বললেন, আপনি নূরজাহানের স্বামীকে একইভাবে হত্যা করুন। উক্ত ফরিয়াদি ভারতেশ্বরের ন্যায়বিচারে মুগ্ধ হলেন। সম্রাট ও তার পরিবারের পূর্ণ দায়িত্ব নিলেন এবং নূরজাহান হরিণ শিকার বন্ধ করে দিলেন।
বর্তমান বিশ্বেও এমন বিচার ব্যবস্থার নজির বিরল নয়। ব্রিটেনের সম্রাজ্ঞী মহারাণী ভিক্টোরিয়া এই বলে একটি আদেশ জারি করেন যে, বিচার প্রক্রিয়ায় বা আইনের ফাঁকফোকরে শত অপরাধী পার পেয়ে গেলেও কোনো একজন নিরপরাধী ব্যক্তিও যাতে শাস্তি না পায়। আর এ কারণেই বিচারকের ভাবমূর্তি এমনভাবে গড়ে উঠেছিল যে, আদালতে তার আসনটি অনন্য মর্যাদা লাভ করেছিল।
অতীতে কোনো আসামিকে মৃত্যুদ- দেয়ার পূর্বে বিচারকরা অনেক সময় আহার নিদ্রা সব ত্যাগ করতেন, এমনকি ফাঁসির আদেশ সই করে কলম ভেঙে ফেলে অনেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। এ কারণে যে, তাদের মনে শঙ্কা থাকতো তাদের রায় যদি সঠিক না হয় বা কোনো কারণে ভুল হয়, তাহলে এটা হবে হত্যাকা-ের শামিল। যার জন্য তাকে পরকালে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
বর্তমানে সব সভ্য দেশেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। হয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কেনিয়ার মতো দেশও আদালতের নির্দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে আদালতের নির্দেশে পদত্যাগ করেন। আদালতের নির্দেশে থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ বছরের জেল হয়েছে। একই নিয়মে দুর্নীতির দায়ে দ-িত হয়েছেন ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্টও।
রাশিয়ার সাথে আঁতাত করে হ্যাক করার মাধ্যমে ২০১৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হয়েই সাতটি প্রধান মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। সাথে সাথে বাতিল হয়ে যায় লাখ লাখ ভিসা। বিমানবন্দরে আটকা পড়ে হাজার হাজার যাত্রী। আবার অনেক যাত্রীকে দেশে ফিরতে হয়। বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি ঘোষণা করলেন ÒBy the Authority Vested in me as President by the Constitution and the Laws of the United States of America Including the Immigration and Nationality Act. and to Protect the Nation From Terrorist Activities by the Foreign Nationals Admitted to the United States” It is hereby Ordered as Follows.
১৯৫২ সালের যে আইনটির কথা ট্রাম্প বলেছেন, এই আইনটি ১৯৬৫ সালে এভাবে সংশোধিত হয় “No Person Shall Receive Any Preference or Priority or be discriminated against In the Issuance of an Immigrant Visa Because of the Persons Race, Six Nationality, Place of Birth or Place of Residence.”এই আদেশে সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে তা ১৯৬৫ সালের আইনের পরিপন্থী। অথচ এই নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলায় এই সাতটি দেশের নাগরিকদের কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আইনের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধৃষ্টতা বলেই মনে করেন।
অনেকের মতে স্বাধীন বিচার ও শাসন ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার পরিবর্তে কোনো স্বার্থ হাসিলকারী মহলের নিকট চলে গেলে দেশের বিচার ব্যবস্থা সুশাসন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং জনগণের নৈতিক অধিকার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। ফলে উদার সহনশীল শিষ্টাচারের পরিবর্তে রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গনে তৈরি হয় ব্যক্তি শত্রুতা প্রতিহিংসা ঈর্ষা, ব্যক্তি ঘৃণ্যতা, গুম, খুন এবং বিচারহীনতার মতো অবস্থা। যা একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অবকাঠামোকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়। এতে জাতি হারায় তার শির উঁচু করে কথা বলার অধিকার এবং ব্যক্তি হারায় তার আত্মপক্ষ সমর্থন বা স্বীয় মতামত ব্যক্ত করার অভিপ্রায়।
অনেক আইন প্রণেতা ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে আজ্ঞাবহ করে নির্বাহী বিভাগ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে চেয়েছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘বিচার বিভাগ স্বাধীন’ ঘোষণা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট তাদের সেই দুঃস্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়ে এদেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশংসনীয় শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার জন্য সমগ্রজাতি তাদের নিকট কৃতজ্ঞ। আর এ রায় সারা বিশ্বকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে মনে করবে বলে ১৬ কোটি জনগণের ধারণা।
লেখক : দফতর সম্পাদক, মুসলিম লীগ
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দেশ অর্থনীতি











