স্বপ্নপূরণে পাশে পেয়েছি ড্যাফোডিল ও কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়কে

অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
আমাদের সব স্বপ্নই সত্যি হয় যদি সাহস করে সেই স্বপ্নকে খুঁজে নিতে পারি। ভবিষ্যৎ যখন ডাক পাঠায় তখন সেই স্বপ্ন হয়ে ওঠে অনিবার্য।
আমি উচ্চশিক্ষা শুরু করি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের মাধ্যমে। শুরু হয় স্বপ্নের কাছে পৌঁছানোর পালা। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের একেবারে শুরু থেকে পড়াশোনা, সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিভিন্ন ক্লাবের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া প্রভৃতি বিষয়ে সচেতন ছিলাম। আরও আগে ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল দেশের বাইরে পড়ালেখা করব। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি এখান থেকে শিক্ষার্থী বিনিময় প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশের বাইরে পড়ালেখা করার সুযোগ রয়েছে। ডিআইইউ ব্যবসায় ও শিক্ষা ক্লাবের এক বন্ধু হঠাৎ একদিন আমাকে জানাল তুরস্কের মেভলানা বৃত্তির ২০১৭-১৮ সেশনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। দেরি না করে ডিআইইউর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিসে যোগাযোগ করি। এরপর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস থেকে আমার সব কাগজপত্র তুরস্কে পাঠানো হয়। ড্যাফোডিলের অপর চার শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমিও নির্বাচিত হই তুরস্কের কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাওয়ার জন্য।
দেশের বাইরে যাওয়ার এটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। সংগত কারণে আমি ছিলাম খুবই আবেগাক্রান্ত। ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ আকাশযাত্রা শেষে যখন ইস্তানবুলে পা রাখলাম তখন অভূতপূর্ব সুন্দর এক দেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বাসে আমরা কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালাম। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর শুরু হলো এক নতুন দিন। কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। কী সৌভাগ্যের ব্যাপার! সেখানে পূর্বপরিচিত কয়েকজন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, যাদের সঙ্গে এর আগে বাংলাদেশে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
চারপাশে পাহাড় আর অনিন্দ্যসুন্দর মসজিদ দিয়ে ঘেরা কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। কারাবুকের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন সূর্যোদয় দেখছিলাম আর সুমধুর আজান শুনছিলাম তখন মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, স্বপ্নের জগতে আছি নাকি বাস্তবে আছি! তুরস্কের বেশ কয়েকটি শহরে ঘুরেছি। দেখেছি ঐতিহাসিক ইন্সট্যান্স, সাফরানবুলো, আমাসরা, জংগুলদাগসহ বিভিন্ন জায়গা। এছাড়া আমি ঘুরতে গিয়েছিলাম বুলেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সেমিস্টারে ডিআইইউর ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান এসেছিলেন কারাবুক ইউনিভার্সিটি পরিদর্শনে। তিনি যখন আমাদের উদ্দেশ করে বলছিলেন, ‘তোমরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ, তোমরা আমাদের গর্বিত করেছ’ তখন আনন্দে বুকটা ভরে উঠেছিল। এই সফরে ড. মো. সবুর খানের সঙ্গে আরও ছিলেন ডিআইইউর পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইমরান হোসেন ও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হান-উল-ইসলাম।
কয়েকদিন পর কারাবুকে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হলো। প্রধান সমস্যা ছিল, ভাষার প্রতিবন্ধকতা। বেশিরভাগ শিক্ষকই তুর্কি ভাষায় পড়াচ্ছিলেন। ফলে ক্লাসের পড়া বোঝা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। তবে শিক্ষকরা এতই আন্তরিক ছিলেন যে তারা ক্লাসের বাইরেও আমাদের আলাদাভাবে সময় দিতেন। এর মধ্যে আমি তুর্কি ভাষায় এক থেকে একশ পর্যন্ত গুনতে পারাসহ কিছু তুর্কি ভাষা শিখে ফেলি। এখন তুরস্কের দোকানদারদের সঙ্গে দামদরও করতে পারি!
কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর রোমানিয়া, পাকিস্তান, ভারত, কাজাখস্তান, মিসর ও জর্ডানের বেশ কজন বন্ধু পেয়েছি। তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনেছি। আমরা সবাই মিলে ইস্টার সানডে উদ্যাপন করেছি। বাংলা নববর্ষও পালন করেছি। সেদিন আমরা বাঙালির ঐতিহ্যবাহী শাড়ি পরেছিলাম। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের শাড়ি দেখে অন্য দেশের বন্ধুরা বিস্মিত হয়েছিল।
তুর্কিদের আতিথেয়তা মুগ্ধ করার মতো। আমি কখনও ভাবিনি এই জায়গার প্রেমে পড়ে যাব। তুর্কিদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। বিদেশিদের প্রতি তাদের ভালোবাসা, একা একা স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করা, বৃহৎ পরিসরে নিজেকে তুলে ধরাÑএসব অভিজ্ঞতা আমার ভেতরের শক্তি ও সামর্থ্যকে আমার সামনে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছে। আমি নিজের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পেরেছি।
কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষার্থীদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কুলবিস উৎসব’-এ অংশ নিয়েছিলাম। এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের ৫৩টি দেশের চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিজ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরে। ওইদিন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের সামনে নিজ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে পেরেছিলাম বলে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছিল। আমাদের স্টলে সেদিন বিরিয়ানি রান্না করেছিলাম। বিরিয়ানি খেয়ে রেক্টর অধ্যাপক ড. রেফিক পোলাত ও অন্য শিক্ষকরা বলছিলেন, আবার যদি আমরা বিরিয়ানি রান্না করি তবে যেন তাদের নিমন্ত্রণ জানাই। তারা বাংলাদেশে বেড়াতে যাওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন। আমাদের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি দেখে আমাদের সঙ্গে অনেকেই ছবি তুলেছেন। এই দলে ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদস্যরাও। তারা আমাদের খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দারুণ পছন্দ করেছেন। শিক্ষার্থী বিনিময় প্রোগ্রামের এটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
আমি উচ্চশিক্ষার জন্য ডিআইইউকে বেছে নিয়েছি, কারণ আমি জানতাম এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। এজন্য আমি ড্যাফোডিলের কাছে চিরঋণী থাকব। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও কারাবুক ইউনিভার্সিটি একটি পরিবারের মতো। আমি মনে করি এই সম্পর্ক ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে পারব। এই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও আমার বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি ধন্যবাদ জানাই ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রতি।
নাহিদ সুলতানা
তুরস্ক সরকারের মেভলানা বৃত্তি নিয়ে কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত