দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বন্ধ করা জরুরি

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
আর্থিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার হওয়া বর্তমানে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাকে এখন আর অস্বাভাবিক মনে করার কিছু নেই। ’৭১-এ স্বাধীনতার পর থেকেই এর প্রবণতা লক্ষণীয় হয়ে আসছে, যা বর্তমানে সুযোগ সন্ধানীদের অতিমাত্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সুযোগ সন্ধানীরা তখন সুকৌশলে সেই সরকারের ভেতরে ঢুকে রাষ্ট্রের চলমান অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে নিজেরা স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে ওঠে, যা একটা উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় এদের কাউকে চিহ্নিত করা গেলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে এরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিছু লোকের মতে, এরা সরকারের ভেতরেই নাকি সরকার তৈরি করে বসে আছে। এদের অবস্থান খুবই শক্ত। সরকারও নাকি এদের থেকে সুযোগ সুবিধা (আর্থিক ও রাজনৈতিক) আদায় করে থাকে। যার ফলে সরকার প্রকৃত অপরাধীদের বের করে শাস্তির আওতায় আনতে পারে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থ পাচারকারীরা এদেরই একটা বিরাট অংশ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নয়া দিগন্তের নবম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ‘সন্দেহজনক লেনদেন অশনি সঙ্কেত’ লেখায় এসব অর্থ পাচারের কিছু চালচ্চিত্র ফুটে উঠেছে। সুশীলসমাজের অনেকেই বলেন, সরকার যখন প্রকৃত গণতন্ত্রের কথা ভুলে গিয়ে অতি রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকার নেশায় পড়ে থাকে; তখন সুযোগ সন্ধানীরা সরকারের সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। আর দায়িত্বশীলেরা তখন দায়হীন কথাবার্তা বলে সাধারণ লোকের কাছে হেয়প্রতিপন্ন হন, সেই সাথে নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে চান। ফলে দায়িত্বশীলদের এই অযোগ্যতা সমাজ, জাতি তথা দেশকে লুটপাট, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। প্রশাসনও তখন প্রকৃত স্বার্থ ও ন্যায়নীতি ভুলে সরকারে ক্ষমতায় থাকার অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে করে রাষ্ট্রে উদার রাজনীতির পরিবর্তে দুর্বৃত্তের শাসন কায়েম হয়। রাষ্ট্র পরিণত হয় ব্যর্থ রাষ্ট্রে।
নির্বাচন সামনে রেখে অতীতের মতো এবারো চলছে বিপুল পরিমাণে অর্থ পাচার, যা অর্থনীতির বিশ্লেষক ও গবেষকদের কথাবার্তায় স্পষ্ট বোঝা যায়। তাদের মতে, অজানা রাজনৈতিক আশঙ্কায় অনেকেই উন্নত বিশ্বে পরিবার নিয়ে সুখে থাকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে তৈরি করেছেন সম্পদের পাহাড়। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশে বিনিয়োগ করেছেন এসব সম্পদ। এ সম্পদের পুরোটাই দেশে দুর্নীতি, অবৈধ আয় এবং অবৈধ পথে পাচার করার মাধ্যমেই অর্জিত।
এ পরিস্থিতিতে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআর কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যান মো: মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া নির্বাচনের বছরে অর্থ পাচার ঠেকানোর কথা বলে জানান, এটির একটি নীতিমালা তৈরি হবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক জানানোর পর সেই ফাইল এনবিআর দেখবে। উভয় প্রতিষ্ঠান মিলে তথ্য বিনিময় করে এর সন্দেহজনক তথ্যের ক্লু বের করে সমাধানের ব্যবস্থা থাকবে। এসব ক্লু-এর মধ্যে রয়েছেÑ সন্দেহজনক এলসি, অবৈধ লেনদেন বা ঋণপত্র খোলা, আমদানি-রফতানিতে বড় ধরনের সন্দেহ বা আমদানি-রফতানি পণ্য সঠিকভাবে পরীক্ষা করা। আবার শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগের আড়ালেও মেশিনারিজ আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে উন্নত দেশে অর্থ পাচার করা হয়। এ ক্ষেত্রে বাড়তি মেশিনারিজ ও ৭৫ শতাংশ কটন আমদানিতে সন্দেহ থাকছে। আবার রফতানির পূর্ণ অর্থও দেশে আনা হচ্ছে না, সাথে মুনাফার বিরাট অংশ দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকলেও সরকারের দুই মেয়াদকালে নিজেদের যারা দুর্নীতির আকণ্ঠে নিমজ্জিত করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, জনরোষানল ও নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা থেকে বাঁচার জন্য অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি অবলীলায় দায়িত্বহীন কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন। দেশের জনগণ নির্দ্বিধায় তা উপলব্ধি করছে, আর মনে মনে হাসছে। ক্ষমতা হারানোর ভয় বা নিজেদের অপকর্ম যখন নিজের বিবেককে নাড়া দেয়, তখন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন কথা বলে। প্রবাদ আছেÑ ‘মানুষ অন্ধকারে ভয়ে চিৎকার করে গান গায়।’
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, পানামা পেপার্স প্যারাডাইস পেপার্সে যাদের নাম এসেছে; তাদের বিষয় খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থা। পানামা পেপার্স ও প্যারাডাইস পেপার্সে যাদের নাম আসছে; তাদের বিষয়ে বিএফআইইউর সাথে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্ট সেলের গোয়েন্দারা কাজ করে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে বেশ ক’টি ঘটনাও শনাক্ত করা হয়েছে এবং অধিকতর তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তিনটি মূল কারণÑ প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলে অর্থ পাচারও বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়া। অর্থ পাচার রোধ করতে হলে যেকোনোভাবেই হোক দুর্নীতি ঠেকাতে হবে, বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি পরিষদ সম্পাদক ড. জামালউদ্দীন আহমেদ বলেন, অর্থ পাচারকারীদের অনেকেই চেনেন, আর এদের ধরাও সহজ। যারা অবৈধ টাকা আয় করছে, তারাই পাচারকারী। ব্যাংকের সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। আমদানি-রফতানিতেও যাতে মিথ্যা ঘোষণা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। হুন্ডির মাধ্যমেও টাকা পাচার হয়। আর হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার বেশি হয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিচালক বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের বছর হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার কারণে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি জিএফআই ২০১৭ সালের ১ মে প্রকাশিত উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার ২০০৫-১৪ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে ১০ বছরে পাচার হয়েছে ন্যূনতম সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। আর এই অর্থে মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম এবং কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি করেছেন বাংলাদেশীরাই।
সর্বশেষ আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রীর ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশের ঘোষণা অনুযায়ী দায়িত্বশীল লোকদের দুর্নীতি পরিহার করে জননিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিতি পাবে, এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন