

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
কে লইবে মোর কাযর্, কহে সন্ধা রবি
শুনিয়া জগত রহে, নিরুত্তর ছবি
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল স্বামী
আমার যতটুকু সম্ভব, করিব তা আমি…।
এমন বাদল দিনে বাহিরে কেউ যায়…? হাঁ যায়, আমাদের কোমলমতি সোনার ছেলেরা! রোদ ঝড় বৃষ্টি সব বাধাকে অতিকৃম করে আজ তারা রাস্তায় নেমে এসেছে স্ব-উদ্বেগে, আসলে এটাই বাস্তবতা। কেন রোদ-বৃষ্টি, পুলিশের হুমকি, লাঠি উপেক্ষা করে আমাদের কিশোর-তরুণরা রাস্তায়। কারও উসকানিতে নয়, কারও নেতৃত্বে নয়। কোনো রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে নয়। ওরা দাঁড়িয়েছে নিয়মের পক্ষে,অনিয়মের ও অচলায়তনের বিরুদ্ধে, দুই বাসের প্রতিযোগিতায় কলেজগামি দুইজন সহপাঠির অকাল মৃত্যুতে।
রাজীব আর দিয়ার পরিবার পেয়েছে মৃত্যুর জন্য নগদ অর্থ, পেয়েছে বিচারের আশ্বাস। এটাই কি শেষ? কিন্তু কিশোর-তরুণদের এই আন্দোলন কি শুধু রাজীব-দিয়ার পরিবারকে নগদ অর্থ সাহায্যের জন্য ছিল? কিশোর-কিশোরীদের নয় দফা দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস এসেছে সরকারের তরফ থেকে। তাই যদি হয়, তবে মিরপুরে ওদের আবার লাঠিপেটা কেন? পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মারছিল কারা? সোসাল মিডিয়াতে দেখলাম, পুলিশের হাতে মার খাওয়া এক ক্ষুদে শিক্ষার্থী বলতেছে, তোমার ছেলে যখন এইদৃশ্য দেখে তোমাকে জিজ্ঞাসা করবে তখন তুমি কি উত্তর দিবে? যখন যানবাহনে কোন দুর্র্ঘটনা হয়, কিছু লোক মারা যায়, আমরা তখন যানবাহনের ফিটনেস থাকানাথাকা নিয়ে আলাপ আলোচনা করি এবং ফিটনেসবিহীন জানবাহনকে দায়ী করি, তাইলে কি ফিটনেস জানবাহনইকি দুর্ঘটনা ঘটাতে পারবে আর ফিটনেসবিহীন জানবাহন দুর্ঘটনা ঘটাতে পারবেনা? সমাজ স্বচেতন অনেকের মতে, জানবাহনের ফিটনেস থাকা না থাকার সাথে দুর্ঘটনার কি সম্পর্ক, নাকি এটা সরকারের দায়ীত্তশীল লোকদের নিজেদের দায়ীত্ত এড়ানোর একটা কৈাশল। এসব লোকেরা নিজের বিবেককে একবারও কি প্রশ্ন করেছেন? সরকারের প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা আস্থা রাখতে পারছে না কেন? এটা কি ছল ছাতুরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোটা আন্দোলনকে স্থগিত করার আড়ালে কোটা আন্দোলনের নেতাদেরকে গ্রেপ্তার ঘুম খুন করা, নাকি সব দায় বিএনপি-জামায়াতকে দিয়ে নিজেরা ধোয়া তুলশী পাতা সাজা?
বসবাসের অযোগ্য দেশ হিসাবে আমাদের বাংলাদেশকে বা আমাদের প্রিয় শহর ঢাকাকে প্রতি বছর লজ্জারমাথা হেটকরে প্রথম সারিতে জায়গা করে দেয়, আর আমরাও স্বরবে-নিরবে এটা মেনে নেই। এটা প্রতিহত করার মতো তথ্য রিপোর্ট কেউ বানাতে পেরেছেন কি, নাকি এটাও বিএনপি-জামায়াতের চাল? আয়সূচক বাড়লেই কি আমাদের দেশটি বসবাসের যোগ্য হয়ে ওঠে? আয় বেড়েছে শুধু নিদৃষ্ট একটা দল এবং নিদৃষ্ট কিছু লোকের, এটা আসলে অর্থনীতির জটিল মারপ্যাঁচে হাতে গোনা কজনার। ১৬কোটি মানুষ কি পেয়েছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার? একটি দেশে নিরাপদ সড়কের দাবি শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি হবে কেন? এটি তো আমার-আপনার সবার অধিকার। হ্যাঁ প্রশ্ন অবশ্যই ওঠে, যে দেশে ছোট শিশুরা রাস্তায় যত্রতত্র পড়ে থাকে, সেখানে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন নিরাপদ সড়কের চিন্তা করাটা কিছুটা বেমানানই বটে। সেখানে অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা বিলাসিতারই একটা অংশ, এটা রাজনীতির বিতর্কের পর্যায়ে যাবার কাজ নয়। কিন্তু দায়ীত্তশীলদের নিকট একটাই প্রশ্ন? কেন এই আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ভাবা হচ্ছে আর কেনইবা দায়ীত্তশীলরা নিজের দায়ীত্ত অন্যের ঘাড়ে ছাপাচ্ছেন? ভুল স্বিকার করে ক্ষমা চাওয়াটাতো অনেক কৃতিত্তের কাজ, এতে সন্মান বাড়ে বইকি কমেনা। দেশকে নিরাপদ, সুন্দর করার জন্য ওরা দাবি তুলেছে। ওদের দাবি পূরণ হলে তো সরকারেরই লাভ। জনসমর্থন তখন সরকারের পক্ষেই যাবে। আমাদের রাজনীতিবিদরা কেন বোঝেন না যে সরকারের সমালোচনা করা মানেই সরকারের বিরোধিতা নয়, সরকারকে গঠনমূলক করা, সরকারকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া। আমরা সারাক্ষণ সমালোচনা করি নতুন প্রজন্মের আবেগ নেই, দেশকে ভালোবাসে না, শুধু ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, বন্ধুবান্ধবের জগতে স্বার্থপর হয়ে জীবন কাটায়। কিন্তু এ প্রজন্মই প্রমাণ করেছে আমরা কতটা ভুল করেছি বা ভুল করতেছি, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমরা আসলে কতটা স্বার্থপর, লোভী, দুর্নীতিবাজ। অনিয়মকে আমরা কিভাবে নিয়মে পরিণত করি।
আমাদের বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা কি বুঝতে পারেন, কখন হাসতে হয়, কখন কাঁদতে হয়? তাও কি আমাদের রাজনীতিবিদদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে? নাকি নিজেদের অযোগ্যতার প্রমান দিলেন? তাই তার বোঝার ক্ষমতা ছিল না যে এই দৃশ্য কান্নার দৃশ্য, হাসির নয়। সমালোচনার তোপে তিনি বলেন, ‘আমি একটু বেশি হাসি, তা যদি দোষ হয়, তবে আর হাসব না…। আসলে জবাবদিহীতাবিহীন ক্ষমতায় থাকতে থাকতে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি সবই হারিয়ে পেলেছেন। শিক্ষার্থীদের ভাষা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলাধোনা করছি। কিন্তু চিন্তা করুন তো, তারা কেন নোংরা ভাষা ব্যবহার করবে? সর্বদা বিএনপি-জামায়াতের যে জুজুর ভয় পান, তার সন্ধান এখানে করুন। দয়া করে খুঁজে বের করুন আপনি নিজ বাসায় কোন ভাষা ব্যবহার করছেন? আপনার থেকেই তো আপনার সন্তান শিখছে, তাই নয় কি? ওরা ছোট, ভুলভ্রান্তি হবেই। কিন্তু ওরা আমাদের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে। ক্ষমতায় থেকে বড় হয়ে কি আমরা মানবিকতার সঙ্গে ওদের কাউন্সেলিং করতে পারি না ? না পিটিয়ে, পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভুল শোধরাতে পারি না ?
প্রতিবারের মতো এবারও আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বড়দের মত কোমলমতি শিক্ষর্থিীদের প্রতিপক্ষ হয়ে গেল ? কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যকে দেখলাম কী চমৎকারভাবে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করতে। আবার ব্যাটন দিয়ে পেটাতে থাকা পুলিশকেও আমরা দেখেছি। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো পুলিশ, মন্ত্রীদেরও দেখা গেছে অনেক। কিন্তু দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো দেশের মানুষের প্রতিপক্ষ নয়। আমরাও ভুলে যাই না যে, দিন-রাতকে এক করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের জন্যই কাজ করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেই নিজেদের ভাল কাজের জন্য পুরুস্কারও পেয়েছেন। যেমন, কদিন আগে জাহাক্সিগর গেটের সামনের রাস্তায় হুন্ডা এক্সিডেন্ডকারি লোকের সেবাদানকারি একজন মহিলা পুলিশ কর্মকর্তা এবং ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে বাস দুর্ঘটনায় জীবন বাজি রেখে উদ্বারকারি এক পুলিশ সদস্যের ভাল কাজের ফল। আর ওদের মধ্যে যারা অন্যায় করছে চলুন তাদের ভুল ধরিয়ে দিই, জনসম্মুখে তাদেরকে তিরস্কার জানাই। কিন্তু সামান্য কজনের জন্য সমগ্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়ী করা বুদ্ধিমান এবং সাহসীদের সাজে না, খারাপ কিছু লোক সবখানেই আছে, আমরা আইন চাই, বাস্তবায়ন চাই কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে নয়, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়ীত্ত্বরত সকলের নৈতিক শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমাদের শুধু একটাই ভয় এখন, এই আন্দোলন বিরামহীনভাবে চলতে না থেকে যদি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত না হয়,অথবা এই আন্দোলন চলতে থাকলে এই শিক্ষার্থীদের যদি কিছু হয়! যদি আরও কঠোর নির্দেশ আসে এদের নিয়ন্ত্রণ করার, যেটা মিরপুরে দেখলাম! একজন স্বচেতন নাগরিক হিসাবে শিক্ষার্থীদের গায়ে পুলিশের লাঠি পেটানোর দৃশ্য সহ্যেরও অতীত। বেশী সময় ধরে এ আন্দোলন চলতে থাকা উচিত নয়,আমরা দেশের উন্নয়ন চাই, নিরাপত্তা চাই এবং চাই প্রত্যেকটা নাগরিকের জীবনের নীরাপত্তা ও শীর উচুকরে কথা বলার অধীকার। এই ঘুণেধরা ভীতিকর সমাজের অবক্ষয় চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মই দেখিয়ে দিতে পেরেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ দেশের একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে একটাই অনুরোধ রাখবেন কি? ওদের আশ্বাস দিয়েছেন, কিছু কার্যকর হওয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু ওরা তো অনেক ছোট। আবেগের তীব্রতা বেশি, প্রকাশও বেশি। পারবেন কি একটু আদর দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে দুটো কথা বলতে? পারবেন কি নিজের সন্তানের মতো ওদের বুকে টেনে নিতে? এই দেশটা ওদের। ওরাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। ওরা শুধু ভালোবাসা চায়, সুন্দর জীবন চায়, রাজনীতির পরিশীলিত বুদ্ধিদীপ্ত আশ্বাস নয়। তারা চায় এমন একটা দেশ, এমন একটা পরিবেশ, যেখানে থাকবেনা ক্ষমতার অপব্যাবহার, প্রতিহিংশা বিরোধ বা হানাহানি, যেখানে ছাগল নেকড়েবাঘ একসাথে পানি পান করবে, কিন্তু কেউ কারো ক্ষতি করবেনা, এটাই হবে আজকের প্রত্যাশা।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন।












