-রিন্টু আনোয়ার।
শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদন্ড। আর সে মেরুদন্ড গড়ার কারিগর শিক্ষকরা। সুশিক্ষা, নৈতিকতা, সততা, নিষ্ঠার শিক্ষা দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তুলবেন, এটিই শিক্ষকদের কাছে জাতির প্রত্যাশা। কিন্তু, এই প্রত্যাশাটা আজ যেন হতাশায় ডুবতে বসেছে। আমারা জানি মেধাবী মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নবাজ। কিন্তু সেই স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় কিছু জ্ঞানপাপী কতিপয় তথাকথিত শিক্ষক। ক্ষমতা-অর্থের কাছে নিজের নৈতিকতা ও আত্মমর্যাদা বিক্রি করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে কাউকে শিক্ষক বানানোর মতো ঘৃণিত কাজ করাসহ শিক্ষাগুরুদের একেক কাণ্ড গণমাধ্যমে হচ্ছে শিরোনাম। আমার বা কারো লেখা-না লেখায় তাদের কি কিছু যায়-আসে? গত বছর কয়েক ধরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু ঘটনা নামমাত্র শিক্ষিত বা অশিক্ষিতদেরও লজ্জা দিচ্ছে।
নানা ধরনের অন্যায়-অনৈতিক কাজে শিক্ষকদের জড়িয়ে পড়া যেন এখন তেমন ঘটনাই নয়। কেবল সাধারণ শিক্ষক নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি হতে একেক জনের দলকানা কর্মকাণ্ড মহল্লার দলীয় কর্মীকেও হার মানাচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই নোংরামিটা সবচেয়ে তেজি। সাধারণ শিক্ষকদের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষপদ ভাইস চ্যান্সেলরদের কারো কারো অনিয়ম-দুর্নীতি,বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দলবাজির তথ্য জাতিকে হতাশ করছে। যা লেখার অযোগ্য। তবে সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পক্ষ নিয়ে ৩৪-৩৫ ভিসির ক্রিয়াকাণ্ডে এর কিছুটা রেশ পড়েছে। বাকিটা ভবিষ্যৎ।
ভাইস চ্যান্সেলর-ভিসি পদটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্বাহী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার অভিভাবক তারা। দেশের বাদবাকি সবার জন্যও যারপরনাই মান্যজন। ‘স্যার’ সম্বোধনের তেজে তাদের বাপের দেওয়া নামও তলিয়ে যায়। এর বিপরীতে নিয়মিত এবং অবিরাম শুনতে হচ্ছে তাদের একেকজনের নিম্নমানের যতো দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের খবর। আজ একজন তো কাল আরেকজন। সম্প্রতি এ তালিকায় ফর্মে আছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। শাহজালালে তিনি আলোচ্য ছিলেন না। সবজেক্ট-অবজেক্ট কোনোটাই নন। খেয়ে-দেয়ে অনেকটা আনডিস্টার্বেই ছিলেন। মাঝে মধ্যে কিছু ঘটনা ঘটলেও অন্য ঘটনায় তা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চামেচুমে থাকার আর সুযোগ থাকেনি। সেখানে হল প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনার সূত্র ধরে নিম্নমানের কিছু কথা-কাজের খেসারতে দৃষ্টি চলে যায় তার দিকে।
মূলত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ১৩ জানুয়ারি। ওই দিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েক শ ছাত্রী। ১৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ছাত্রলীগ ছাত্রীদের আন্দোলনে হামলা চালায়। পরদিন বিকেলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা ও তাঁদের লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ। ওই দিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ওই হামলার প্রতিবাদে ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, খুলনা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন নাগরিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের এজেন্ডা শিক্ষার সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ। মহামারির ভিতরে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে আর যেন তাদের রাস্তায় না নামতে হয়। গুরুতর জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে দ্বিতীয় কোনো এজেন্ডা তৈরির আগেই ছাত্রদের দাবির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারা সবার জন্যই মঙ্গল।
দেশে এর আগে অবশ্য এ মিছিলে পড়তে হয়েছে আরও কয়েকজন ভিসিকে। নাকানি-চুবানি খেয়ে বিতাড়িতও হয়েছেন তারা। আবার কেউ কেউ লাজশরমের মাথা খেয়ে মেয়াদ শেষ করে আসার বিকৃত গর্ব করছেন। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- বশেমুরবিপ্রবি থেকে ধাওয়া খেয়ে বিদায় নিতে হয়েছে ভিসি অধ্যাপক ড. খন্দকার নাসিরউদ্দিনকে। নিয়োগে-ভর্তিতে দুর্নীতিই নয়, নারী কেলেঙ্কারিসহ আরও নানা অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-বেরোবি থেকে সরে আসতে হয়েছে প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে। অভিযোগ ও কাণ্ডকীর্তি প্রায় একই। তবে একটু ভিন্নতা হচ্ছে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে ইন্ধন দেওেয়ার অভিযোগ ছোঁড়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-রাবির সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এম আব্দুস সোবহানও কম যাননি।
শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার পরিবর্তন করে নিজ মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ, রাষ্ট্রপতিকে অসত্য তথ্য দিয়ে অবসরগ্রহণ, বিভিন্ন নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিসহ বিস্তর অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদায় নিতে হয় তাকে। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে হেনস্তা হওয়া বাড়তি প্রাপ্তি। উন্নয়ন প্রকল্পে ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা দেওয়াসহ নানান অভিযোগ মাথায় নিয়েও দ্বিতীয় মেয়াদে স্বপদে বহাল আছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়- জাবির ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম।
‘চিরকুটের মাধ্যমে’ ভর্তিসহ বেশকিছু অভিযোগ নিয়ে বহাল আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাবির ভিসি প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামানও। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-জবির ভিসি থাকা অবস্থায় ড. মীজানুর রহমানও কম দেখাননি। তবে, ধাওয়া খেতে হয়নি তাকে। ছাত্রলীগের পক্ষ নিয়ে নানা বিতর্কিত মন্তব্য, যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশসহ নানা কারণে বিতর্কিত হয়েও দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন শেষে বিদায় নিয়েছেন তিনি।
গত বছর কয়েকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-চবির ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী,বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়-ববির ড. এসএম ইমামুল হক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-নোবিপ্রবির ড. এম অহিদুজ্জামানরা দেখিয়ে দিয়েছেন ভিসি কাকে বলে! কতো ক্ষমতা-হিম্মত-হেকমত তাদের! ভিসিরা কেন গদি বা ক্ষমতার সেই কাতারে যাবেন? কেন আজ এতো খরা?
ভিসি বা উপাচার্য বলতেই মানসপটে ভেসে ওঠে জ্ঞানতাপস, শান্ত, সৌম্য এক বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ ব্যক্তির অবয়ব আর বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞান সৃষ্টি, আহরণ ও বিতরণ কেন্দ্র। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় বিচরণ করে নিজেদের সৎ, যোগ্য, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতো এক প্রত্যয় নিয়ে। অথচ এখন সলাজে বলতে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নৈতিক চরিত্রের যে অধঃপতন শুরু হয়েছে তা দেশের জন্য বড় হুমকি।
দেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৪৬টি। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে। বাকি তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পাওয়ায় ভিসিরা নিজেদের দলের লোক মনে করেন। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলেও বেশির ভাগ সময় রাজনৈতিক চাপের কারণে ব্যবস্থা নিতে পারে না। তারপরও গত দুই বছরে ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বাকি পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে এখনোও তদন্ত চলছে। ইউজিসি সূত্রে আরো জানা যায়, আইনের সীমবাদ্ধতার কারণে তারা কেবল তদন্ত করে সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করতে পারে কিন্তু নিজেরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না।
যে ভিসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো উঠছে তাদের শতভাগই রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না, বা ব্যবস্থা নেয়া যায় না। তারা বিচারহীনতা উপভোগ করেন। যার কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন বেশী। আর এই উপাচার্যরা পুরো শিক্ষক সমাজকে লজ্জার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এক সময় বলা হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা তাদের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করবেন। কিন্তু তাদের অনেকেই আজ বিবেকবোধ জলাঞ্জলি দিচ্ছেন।
পরিশেষে বলতে হয়,এই দুর্নীতি এবং অনিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদটিকে যেমন দিন দিন অসম্মানিত করছে পাশাপাশি দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ শিক্ষা ও গবেষণাও কমে যাচ্ছে।
লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com












