
খোন্দকার জিল্লুর রহমান

‘সৃষ্টির যা কিছু সুন্দর চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি। শান্তি দিয়াছে-প্রেরণা দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী’। নারী সৃষ্টির প্রেরনা এবং পুরুষ সৃষ্টির ইতিহাস। উভয়ের আশা আকাঙ্খা এবং সমযোতাই সৃষ্টির উৎসব ও জীবনের সফলতা। আর এই সৃষ্টি সুখের ঊল্লাসেই মানুষ কাজের প্রেরনায় এগিয়ে যায়। আর এগিয়ে যাওয়ার জন্য জন্ম থেকেই মানুষের ৫টি মৌলিক চাহিদা থাকে সেগুলি হলো অন্ন, বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা ও জৈবিক চাহিদা। তাও আবার এসব চাহিদার অপরিহার্যতা ক্রমান্ময়ে তৈরি হয়,যা বাদ দেয়ার কোন সুযোগ নাই। এই প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ বেরিয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে, এ কাজের সন্ধান হউক দেশে বা বিদেশে মোটকথা চাহিদা মিটানোই প্রথম প্রয়োজন। কিন্তুু প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে মানুষ লোভ, লালসা, বিলাসিতা, উচ্চাকাঙ্খার বাসনায় নিজেকে অপব্যাবহার বা অশ্লীলতার মাঝে বন্দি থাকতে হয়,বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীদের, তার জন্য দায়ী কে? আর এই নারীই যখন সহিংসতার স্বীকার হয় বা নিরাপত্তাহীনতার স্বীকার হয়, তার উত্তর কি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজের সচেতন ব্যক্তি পর্যন্ত কেউ দিতে পারবে?
গত ১৮ই এপ্রিল ২০১৮ইং নয়া দিগন্তের ৭প্তম পৃষ্টায় প্রকাশিত নারীর অগ্রগতি দেশ হতে দেশান্তরে লেখার মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন কর্মকান্ডে আমাদের দেশের নারীর যে ঈর্ষণীয় অগ্রগতি তা সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। আবার সেই নারীরা যখন মুসলিম ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ত্বের দেশ সৌদি আরব থেকে নির্যাতিত হয়ে দেশের মাটিতে ফিরে আসে আর এতে সারা বিশ্বের নিকট দেশের মর্যাদা কোথায় গিয়ে ঠেকে, এটা একটা মুসলিম দেশ থেকে আরেকটি মুসলিম দেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর চুক্তির নেপথ্যে কে বা কারা জড়িত তাদের থেকে শুরু করে সমাজের দায়ীত্ত্বশীল ব্যাক্তি ও সুশিল সমাজের ব্যাক্তিরা নিজের বিবেককে একবারও কি প্রশ্ন করেছেন কি এ নির্যাতনের দ্বায়ভার কার? সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত স্বচিত্র প্রতিবেদন প্রতি রাতেই চলত নির্যাতন এ গা শিহরে উঠে, সৌদি আরবের মত একটা মুসলিম দেশের মানুষ এত বর্বর হতে পারে কিভাবে তা বিবেকবান মানুষের কল্পনারও বাহিরে।
প্রতি নিয়তই দেখা যায় সৌদি আরব থেকে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসছে। প্রায় প্রতিদিনই বিমান বন্দরে শতশত নারী শ্রমিকের আগমন দেখা যাচ্ছে। এটা একটা উদ্বেগের বিষয়। আর এর পেছনের কারন কি? চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন যার মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। তারা সেখানে গৃহকর্মী হিসাবে কাজ করতে গিয়ে পরিবারের বিভিন্ন সদস্য কতৃক যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়ার কষ্টসহ অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার জরিপে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৩৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। যেখানে ২০১৬ সালের ১২ মাসে এ সংখ্যা ছিল ১৪১ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৮ জন ও গণধর্ষণের শিকার হয় ১০১৭ জন। এটা নারীর একা পথচলার জন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় হুমকি স্বরূপ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তা আশঙ্কাজনক হারে বিঘিœত হয়। অনেকের মতে, ২০১৮ সাল ছিল নারীর প্রতি সহিংসতার বছর। ২০১৮ সাল নারীর প্রতি সহিংসতার বছর হলেও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ২০১৯ সালে যৌন হয়রানি, খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। ধর্ষণ, পিটিয়ে খুনের বেশ কিছু ঘটনা এ বছর আলোচনার জন্ম দিলেও এসব যৌন নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ সকল কিছুই দেশের গন্ডি পেরিয়ে সৌদি আরব সহ মধ্য প্রাচ্যের বহু দেশেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সৌদি সরকার গাড়ি চালনাসহ নানারকম পেশায় নারীদের সুযোগ দেয়ার ফলে এসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নারী শ্রমিকরা বেশী সমস্যায় পড়েছেন। ব্রাক মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর ১১মাসে প্রায় ১২০০ নারী শ্রমিক সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ জন নারীর লাশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। ফিরে আসা নারীদের বেশির ভাগই অসহনীয় নির্যাতিত হওয়ার কথা শিকার করেছেন। এদের কেহ কেহ বিভিন্ন সময়ে দুই তিনটি বাসা পরিবর্তন করেও একই অবস্থার শিকার হন। আবার কেহ কেহ নির্যাতন সইতে না পেরে পালিয়ে দুতাবাসে গিয়ে বহু কষ্টে খালিহাতে বাংলাদেশে ফিরেছেন। সর্ব বিবেচনায় দেশ-বিদেশে অতীতের যেকোনো বছরের চেয়ে এ বছর ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা প্রচুর বেড়ে যায়।
ইসলামেও নারীর যথেষ্ট মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ইসলামিক নিয়মে আছে নারী ঘরে কাজ করবে আর পুরুষ বাইরে কাজ করবে। তার অর্থ এই নয় যে নারীরা বাইরে কাজ করতে পারবেনা। সৌদি আরবেও নারীদের ড্রাইভিংসহ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, দোকান পাট ও শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাবসা পরিচালনার অনুমতি দিয়ে নারীর অগ্রগতিতে ভুমিকা রেখেছে। সমাজে প্রচলিত প্রবাদ আছে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, গুণবান পতি মিলে তার সনে। কথাগুলো অনেক মূল্যবান। নারী মাতা, নারী সুখ, নারী ভালোবাসা, নারী অনুপ্রেরণা। এমন অনেক সুন্দর সুন্দর গল্পগাথা, আছে স্বপ্ন বাস্তবতা, আছে এগিয়ে চলার সাহসিকতা। অনেকে বলে, নারী অবলা, নিরীহ এবং সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার। এটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সত্য হলেও বাস্তবে আমাদের দেশে নারীদের অগ্রযাত্রা অনেক বেশি লক্ষণীয়। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধানবিরোধী দলসহ দুই বিরোধীদলীয় নেতাই নারী সে দেশের নারীর অগ্রযাত্রা কম নয়। আমাদের দেশের নারীরা এখন গৃহ কর্মী থেকে শুরুকরে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কার্যকর ভূমিকাসহ বিদেশে সফলভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। আবার আমাদের দেশেও নারীরা পিছিয়ে নেই, শ্রম মেধা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। দুঃসাহসী ও চ্যালেঞ্জিং কর্মকাণ্ডে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে আমাদের নারীরা। পুরুষের পাশাপাশি নারী সদস্যরা সেনা, পুলিশ, বিমান বাহিনীসহ বিভিন্ন দায়ীত্ত্বশীল পদেও নারীর অবস্থান শীর্ষে এবং নারীরা অত্যদিক সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সাহসিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অনেক বাংলাদেশী নারী সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছে। এত অগ্রগতি স্বত্ত্বেও কেন নারী আজ নির্যাতনের শিকার তা এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে।
যেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীর মর্যাদার প্রতি অত্যধিক যতœবান, তার এই আদর্শ ও নারী উন্নয়নের কথা মনে রেখে দেশের প্রত্যেক নাগরিক নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ রেখে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারী-পুরুষের মর্যাদার আসনকে মূল্যায়িত করবে, তবেই নারীর প্রতি সহিংসতা অকেটাই কমে যাবে। সাথে সাথে সরকার বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন সহ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সোচ্চার থাকবে এসব অপকর্ম ও অনিয়মের প্রতি, এটাই দেশপ্রেমিক প্রত্যেকটি মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক ঃ দফতর সম্পাদক, মুসলিম লীগ, সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ অর্থনীতির ৩০ দিন, রাজনীতিক ও মানবাধীকার কর্মী











